□ ধর্মচিন্তা ও রবীন্দ্রভাবনা □
দেশের অবস্থা যে যথার্থই ভয়াবহ একথা সুস্থ ও গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন সকল মানুষ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন। শুধু অনাহার, মৃত্যু বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয় – নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধ-শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সমস্ত ক্ষেত্রেই আজ সংকটের ছায়া ঘনীভূত। সবচেয়ে বড় সমস্যা হ'ল, মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর ক্রমান্বয়ে যে আঘাত আসছে শাসকশ্রেণীর পক্ষ থেকে, তার বিরুদ্ধে শোষিত-নিপীড়িত মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদকে নির্মূল করার জন্য চলছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়কে ভিত্তি করে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা। তারই সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে পুরাতন ধর্মীয় কূপমণ্ডুক চিন্তা, গোঁড়ামি এবং কুসংস্কারে জনমানসকে আচ্ছন্ন করার সুপরিকল্পিত অপপ্রয়াস। শাসক দলগুলি ক্ষমতার মদমত্ততায় প্রত্যক্ষভাবে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে চলেছে। পরিণতিতে চলছে সাম্প্রদায়িক হানাহানি। অগণিত মানুষের জীবনহানি ঘটছে। এক সম্প্রদায়ের মানুষের শবদেহের উপর ধর্মবাণিজ্যলোভী এক দলের মন্ত্রীত্বের সিংহাসন পাতা হচ্ছে অবলীলায়। এই শতাব্দীর শুরুর সময়েই গুজরাটে সংখ্যালঘু মানুষের রক্তে ভেজা মাটিতে আর লাশপোড়া গন্ধে চূড়ান্ত ভাবে লাঞ্ছিত-অপমানিত হয়েছে মানবিক মূল্যবোধ। এই একবিংশ শতাব্দীতে হরিয়ানায় পাঁচ পাঁচটা চর্মব্যবসায়ীর প্রাণ চলে গিয়েছে ‘বর্ণহিন্দু'দের অত্যাচারে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার সিলেবাসে যুক্তি-বিজ্ঞান-বিচার-বিশ্লেষণের জায়গায় জ্যোতিষশাস্ত্র, গুপ্তবিদ্যা, পুরাতন ধর্মীয় চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রাণপণ প্রচেষ্টায় মত্ত দেশের কেন্দ্রীয় সরকার। ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির জন্য ইতিহাসকে বিকৃত করার ঘটনায় দেশের শুভবুদ্ধি বিস্মিত হতচকিত। যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসারে ব্রতী যারা, যারা সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে মূল্য দিয়ে নির্ভীক সংবাদ পরিবেশনায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন– তাদের হত্যা করা হচ্ছে। রাষ্ট্র তার বিচার করছে না। বরং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে তাকে সমর্থন যোগাচ্ছে। গো-মাংস রাখার ‘অপরাধে' হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে। মানুষের খ্যদ্যাভ্যাসকেও সম্প্রদায়ের রঙে রাঙানো হচ্ছে। এ রাজ্যের বাসিন্দা নিহত হয়েছে রাজস্থানের ধর্মধ্বজাধারীদের হাতে। মানবতার এই লাঞ্ছনার প্রতিরোধ কি সত্যিই অধরা থাকবে? শুভবুদ্ধি এ প্রশ্নও তুলছে স্বাভাবিক ভাবে।
এই অবস্থার মধ্যেই চলে রবীন্দ্র-স্মরণ অনুষ্ঠান। অনেকেই ঘটা করে বেশ জাঁকজমকের মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেন এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। প্রশ্ন জাগে, স্মরণ তো করলাম আমরা– কিন্তু কী নিলাম আমরা তাঁর থেকে? একথা সত্য যে, যে কয়জন মনীষীকে এখনও স্মরণ করা হয় তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের নাম প্রথম সারিতেই আছে। রাস্তার মোড়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত বেজেই চলেছে এই বাংলায়। কিন্তু যেভাবে সাজানো-গোছানো অনুষ্ঠানে বিশেষণের ঘটায় কম্পিতস্বরে আলোচনায় তাঁকে স্মরণ করা হয় তাতে প্রাণের উত্তাপ প্রায়ই থাকে না। বেশির ভাগ মানুষই– যাঁরা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বলেন, তাঁরা বক্তৃতার ঝংকারে এমন একটা ভাব ফুটিয়ে তোলেন যার বেড়া পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে যাওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে বাস্তবিকই একটা দুরূহ ব্যাপার। যে শিক্ষা গ্রহণ করা আমাদের আবশ্যক তা থাকে অনেক পিছনে, সামনে চলে আসে আড়ম্বড়ের ঘটা। অথচ রবীন্দ্রনাথ তো জাতিরই সম্পদ। জাতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে তাঁর থেকে তো নিতে হবে অনেক কিছু। ফলে, যে ব্যাপ্তি নিয়ে তাঁর প্রতিভা বিকশিত, তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, যে extent-এ বা যতটা অর্থে মানবতাবাদের চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর জীবনে এবং সাহিত্যে, তার যথাযথ চর্চা এবং সেখান থেকে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে তার নির্যাস গ্রহণ করার কাজকে এড়িয়ে গিয়ে প্রকৃত শ্রদ্ধাপ্রদর্শন সম্ভব নয়।
দুঃখের বিষয় হল, বেশির ভাগ রবীন্দ্র উপাসকেরা দেশের সমস্যা থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখে রবীন্দ্র সাহিত্যকে ব্যাখ্যা করেন একটা ‘অতীন্দ্রিয়লোকের' বিষয় হিসাবে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই জীবনের সমস্যার স্পন্দন অনুভব করতে সক্ষম হন না। তাই রবীন্দ্রনাথের জীবন ও ঘটনাপ্রবাহ বা সাহিত্য থেকে যেগুলি স্মরণ করলে দেশ ও মানুষের পক্ষে বর্তমান মুহূর্তে যথার্থই শিক্ষণীয় বা কল্যাণকর, তা তাঁদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। অথবা পড়লেও সেগুলিকে তুলে ধরেন না। বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক শিবদাস ঘোষ এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘একদিন মানবতাবাদের আদর্শবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্যচর্চা করতে গিয়েও রাজনৈতিক আন্দোলনের কম্পনে শরৎচন্দ্র কেঁপেছেন, নজরুল কেঁপেছেন– আজকের সাহিত্যিকদের বুকে তার এতটুুকু আলোড়ন নেই, বুর্জোয়া মানবতাবাদের সেই বিপ্লবাত্মক চরিত্রই আর নেই। আজকের বুর্জোয়া মানবতাবাদীরা হচ্ছেন ক্রিয়াহীন তাত্ত্বিক, উন্নাসিক, জীবনে নির্ঝঞ্ঝাট – মাঝে মাঝে আসর গরম করেন রবীন্দ্র ব্যাখ্যা করে, শরৎ ব্যাখ্যা করে, নজরুল ব্যাখ্যা করে। আমি বলি, রবীন্দ্রনাথের বাণী প্রচার করার তোমার তখনই অধিকার, যখন রবীন্দ্রনাথের বুকের বেদনাটা তুমি আজও বুকে বহন কর।''(১) এই বেদনা অনুভব করে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে গেলে, সাম্প্রদায়িকতা, জাত-পাত-বর্ণ বিভেদের যে পরিবেশ আজ দেশের আকাশ বাতাসকে ভারি করে তুলেছে– তার হাত থেকে মুক্তির জন্য তাঁর চিন্তার বহু দিকই স্মরণ করতে হবে।
।। ভারতবর্ষের নবজাগরণের দুই ধারার প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ ।।
আমরা জানি, আমাদের দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ও জাত-পাতের বিভাজনের এবং হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদের সমস্যা ছিল। দেশের নেতারা তার বিরোধিতাও করেছেন। ঐক্য গড়ে তুলতে চেয়েছেন ঐকান্তিক ভাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ভেদাভেদের সমস্যা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। এরই প্রেক্ষিতে স্মরণ করা যাক রবীন্দ্র প্রসঙ্গে লিমহার্স্ট-এর দলিলের একটা অংশ। –‘‘গান্ধীজী বললেন, ‘...আমিও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জাতির মধ্যে ঐক্যে বিশ্বাসী। তাই আমি ইতিমধ্যেই হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য বাস্তবে রূপায়িত করেছি।' রবীন্দ্রনাথ তার প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘না, আমি তা স্বীকার করতে পারছি না। আপনি শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সেই ঐক্য এনেছেন, ইংরেজ শাসনের মধ্যেই সেই ঐক্য এনেছেন। কিন্তু ইংরেজ যখন আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবে, তখন সেই ঐক্য কিসের উপর দাঁড়াবে? আপনি আপনার অন্তরকে জিজ্ঞাসা করুন মুসলমান সম্পর্কে বিদ্বেষ-বিষ কি আপনি সেখান থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করতে পেরেছেন? তাই আমি বলছিলাম, যখন ইংরেজরা চলে যাবে তখন আমাদের কী হবে?''(২)
এই প্রশ্ন তাই সত্যিই মনে পড়ছে আজ স্বাধীনতার এতদিন পরেও। বৃটিশ শাসকরা নিয়েছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি। অথচ আশ্চর্যের বিষয় আমাদের দেশে '৪৭ সালে তাদের রুল চলে গেল, কিন্তু ডিভিশনটা গেল না। থেকে গেল। বর্তমানে আরও বীভৎস রূপেই ঘটছে তার আত্মপ্রকাশ। হিন্দু-মুসলমান, উঁচুজাত-নিচুজাত, প্রাদেশিকতার সংকীর্ণ মনোভাব এই একবিংশ শতকেও দেশের মধ্যে প্রবল ভাবে বিদ্যমান। এর মূল কারণ আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলিতেও যতটা রাজনৈতিক অর্থে একত্রিত হতে চেষ্টা করেছি– সংস্কৃতিগত ক্ষেত্রে কিন্তু তা করিনি। সেখানে আমরা কেউ হিন্দু, কেউ বা মুসলমান ছিলাম। কেউ বাঙালি, কেউ অসমীয়া, কেউ বিহারী, কেউ মারাঠী– এই রকম মন নিয়েই আমরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। কেন ছিলাম, এ আলোচনা স্বতন্ত্র। কিন্তু ছিলাম এটা সত্য। এটা তো ঠিক যে, স্বাধীনতা আমরা চেয়েছি ‘রাম রাজত্বে'র শ্লোগানে। তদানীন্তনকালে বেশিরভাগ নেতাই ছিলেন ব্যক্তিজীবনে অসাম্প্রদায়িক– গান্ধীজীও তাই। আন্তরিকভাবেই তাঁরা হিন্দু-মুসলমান ঐক্য চেয়েছেন, দাঙ্গার ঘটনায় তাঁদের অন্তর যথার্থই ব্যথিত হয়েছে– তবু আমরা ‘একজাতি একপ্রাণ' হতে পারিনি। এ সত্য আজ অস্বীকার করবার কোন উপায়ই নেই। এ প্রসঙ্গে খুব স্পষ্ট না হলেও রবীন্দ্রনাথ একটি ইঙ্গিতও করেছিলেন। ধনতন্ত্রী বা পুঁজিবাদী এই সভ্যতার বিভেদপন্থা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘‘অধীন দেশকে দুর্বল করা, তাহাকে অনৈক্যের দ্বারা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করা... এ বিশেষভাবে কোন সময়ের রাষ্ট্রনীতি, ...যে সময়ে পীড়িতের জন্য, দুর্বলের জন্য, দুর্ভাগ্যের জন্য দেশের করুণা উচ্ছ্বসিত হয় না, ক্ষুধিত ইম্পিরিয়ালিজম স্বার্থজাল বিস্তার করাকেই মহত্ব বলিয়া গণ্য করিতেছে, ...।''(৩) খুব স্পষ্টভাবে সমস্ত দিক থেকে ধরা না পড়লেও এবং তার কার্য কারণের বিস্তৃত পটভূমির বিশ্লেষণ স্বভাবতই না থাকলেও পুঁজিবাদী বিপ্লবের প্রথম যুগের সঙ্গে পরবর্তীকালের কিছু বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য কবির চোখ সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায় নি।
বস্তুত সে কালে মানবতাবাদের পরবর্তী পর্যায়ে সে তার প্রথমযুগের যৌবনের তেজ হারিয়ে হয়ে পড়েছে আপসমুখী। সে তখন গণতান্ত্রিক চেতনার পরিবর্তে ক্রমাগত হয়ে পড়ছে স্বৈরাচারী। এই যুগটা হল সাম্রাজ্যবাদের। এই সময়ের মানবতাবাদ আগের মতো আর চার্চের আধিপত্যকে ভাঙছে না, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রামে ব্রতী নয়, বরং সে আবার আপস করতে চাইছে ধর্মের সঙ্গে, জাতিবিদ্বেষের চর্চা এবং অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে একাত্ম হতে চাইছে। এক সময় পাশ্চাত্যে মানবতাবাদী আন্দোলন ধর্মীয় অন্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এগিয়েছিল, তারাই তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ধর্মের সাথে আপসের পথে পা রাখল। এঙ্গেলস তাঁর ‘সমাজতন্ত্র : কাল্পনিক ও বৈজ্ঞানিক' গ্রন্থের ভূমিকায় এই কথাটিকে উল্লেখ করেছিলেন। বলেছেন যে, বুর্জোয়ারা নিজেদের রক্ষা করার জন্য ‘বাইরের ব্যবহারে একের পর এক ধার্মিক হয়ে উঠতে লাগল... বস্তুবাদ নিয়ে তারা বিপদে পড়েছে। ধর্মকে জিইয়ে রাখতে হবে জনগণের জন্য'। সমূহ সর্বনাশ থেকে ...পরিত্রাণের এই হল একমাত্র এবং সর্ব শেষ উপায়। এরও বেশ কিছু দিন পরে পুঁজিবাদী সভ্যতার এই সংকটের পর্যায়েই আমাদের দেশের নবজাগরণের সূচনা এবং তার বিকাশ।
গভীর প্রজ্ঞায় ভারতবর্ষের নবজাগরণের চরিত্র বিশ্লেষণ করে এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী চিন্তানায়ক শিবদাস ঘোষ দেখিয়েছেন, ‘‘বিশ্বপুঁজিবাদের এরূপ (সংকটজনক) অবস্থায় ভারতবর্ষে পুঁজিবাদের বিকাশ– দেশাত্মবোধ, ব্যক্তিস্বাধীনতার চিন্তা এবং এদেশের মানবতাবাদের জন্ম। ফলে বিশ্বের পুঁজিবাদী ভাবনা-ধারণার অংশ হিসাবেই এদেশে এগুলো এলো বলে শুরু থেকেই এর ভেতরে পাশাপাশি দুটো ধারা আমরা দেখতে পাই। পুঁজিবাদী বিপ্লবের প্রথম যুগের রেনেসাঁসের সময়ের মানবতাবাদের বিপ্লবাত্মক ভাবধারাগুলোও এলো, আবার ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদী যুগের জরাগ্রস্ত হিউম্যানিজম (মানবতাবাদ)– যা ধর্মের সঙ্গে আবার আপস করতে চাইছে, আবার রেসিয়ালিজম-এ (জাতিভেদের মতবাদে) ফিরে যেতে চাইছে, স্পিরিচুয়ালিজম (অধ্যাত্মবাদের)-এর দিকে মুখ ফেরাচ্ছে– সেই জরাগ্রস্ত মানবতাবাদী চিন্তাধারাও একই সাথে এসে গেল।''(৪)
তিনি দেখিয়েছেন, ‘‘একটি ধারা অ্যাগনস্টিক অর্থাৎ সংশয়বাদী, ঈশ্বর আছে কি নেই, তা নিয়ে তর্ক করে না, কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই। মূল টেনডেন্সি (ঝোঁক বা প্রবণতা) হচ্ছে বস্তুজগৎ ও বাস্তব জগৎটাকে বিশ্বাস করার দিকে– এই দিকেই তার ঝোঁকটা বেশি। ...আর একটি ধারা হচ্ছে, যেটা ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মানবতাবাদের মূল্যবোধগুলিকে সংমিশ্রিত করতে চেয়েছে– এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছেন মূলতঃ রবীন্দ্রনাথ। ...তিনিও ....মানবতাবাদী চিন্তা ও মূল্যবোধের একই সুর প্রতিধ্বনিত করেছেন– সেই লিবার্টি (স্বাধীনতা), ম্যানকে (মানুষকে) কেন্দ্র করে সেই হিউম্যানিস্ট ভ্যালু-র মূল্যায়ন, ফ্রিডম-এর জয়গান– সবই তাঁর মধ্যে রয়েছে। অথচ অতি সূক্ষ্মভাবে এরই সাথে মিশে রয়েছে ভারতীয় ঐতিহ্যবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। এর দ্বারা আমি মোটা অর্থে ধর্ম বা ধর্মান্ধতার কথা বলছি না। ...রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ঈশ্বরতত্ত্ব অর্থাৎ স্পিরিচুয়ালিজম-এর সঙ্গে মানবতাবাদী মূল্যবোধের একটা সংমিশ্রণ ঘটেছে। এই সংমিশ্রণ ঘটাতে গিয়ে এদেশের মানবতাবাদ জরাগ্রস্ত ও পঙ্গু হয়েছে।'' (৫)
এর ফলে রবীন্দ্রনাথের বহু চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সময়ে সমাজ অগ্রগতির প্রয়োজনে আমাদের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। অন্ধ উপাসকরা সেই বিরোধকে হৃদয়ঙ্গম করতে অসমর্থ। আবার এও ঠিক যে, শাসককূল রবীন্দ্রনাথের মধ্যে মানবতাবাদী মূল্যবোধগুলির পরিবর্তে তাঁর চিন্তায় দুর্বলতার দিকগুলিকে তাদের শাসন ও শোষণের অনুকূলে কাজে লাগাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও একথাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, একদল বিভ্রান্ত বুদ্ধিজীবী বা অন্ধস্তাবকের দলকে দিয়ে শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথকে এভাবে ব্যবহার করছে। রবীন্দ্রচিন্তা, রবীন্দ্রদর্শনকে সুকৌশলে এমন এক অতীন্দ্রিয়লোকে স্থাপন করা হয়, যেখানে সাধারণের প্রবেশ অবাধ নয়।
আজ দেশের মধ্যে হিন্দু মুসলমানে যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুভবুদ্ধিকে পীড়িত করছে– দেশের মধ্যে সনাতন ঐতিহ্যের নাম করে যে অন্ধতার চর্চার অপচেষ্টা চলছে, চলছে ধর্মের নামে উন্মাদনা– তারই প্রেক্ষিতে ঈশ্বরচিন্তা বা ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত না হলেও রবীন্দ্রনাথ মানবতাবাদের যে চিন্তাকে তুলে ধরেছিলেন– তার থেকে বর্তমান সময়ে শিক্ষাগ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে। দেশজুড়ে যখন মন্দির-মসজিদ নিয়ে তর্ক চলছে, হিন্দু মুসলমানে চলছে বিভেদ, অনেকের মধ্যে আবার এই বিভেদ নিয়েই রয়েছে গরিমা। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়েও এবং তার গৌরবগাথার বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও বেদনাবিদ্ধ হয়ে তিনি বলছেন, ‘‘হিন্দু মুসলমানের পার্থক্যটাকে আমাদের সমাজে আমরা এতই কুশ্রীভাবে বেআব্রু করিয়া রাখিয়াছি যে, কিছুকাল পূর্বে স্বদেশী অভিযানের দিনে একজন হিন্দু স্বদেশী প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাঁহার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে কিছুমাত্র সংকোচ বোধ করেন নাই।''(৬) রবীন্দ্রনাথ যাকে কুশ্রী বলেছেন আজও সে ভাব বহু প্রযুক্তি উপকরণে সজ্জিত দাওয়ায় বিদ্যমান। আজ সমগ্র দেশজুড়ে জাতপাতকে ভিত্তি করে চলছে বিদ্বেষ হানাহানি। শাসকদলগুলির প্রত্যক্ষ মদতে রাজনীতির অঙ্গনও এই ভেদবিভেদের দোষে দুষ্ট। আর তদানীন্তন সময়ে যখন দেশ মধ্যযুগীয় সংস্কারে আচ্ছন্ন, তখন শান্তিনিকেতনে জাতিভেদ, বর্ণভেদকে দূর করার চেষ্টা করবার জন্য তিনি প্রতিজ্ঞাপত্রে লিখেছিলেন, ‘‘এতকাল হিন্দু সমাজে যাহারা অন্ত্যজ বলিয়া গণ্য, অদ্য হইতে তাহাদের সহিত পানাহারে সামাজিক বাধা মানিব না। ইহাতে সমাজে তিরষ্কৃত হইলেও এই প্রতিজ্ঞা পালন করিব।''(৭) প্রসঙ্গত একথাও উল্লেখ্য যে, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের ব্যবস্থাপনায় রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মচর্যাশ্রমে কঠোরভাবে হিন্দু অনুশাসন পালিত হত। সেখানে বর্ণভেদ মানাই আবশ্যক ছিল। এমনকি শিক্ষক কুঞ্জলাল ঘোষকে ব্রাহ্মণ ছাত্ররা ‘পদস্পর্শ' করে প্রণাম করবে কিনা তা নিয়েও রবীন্দ্রনাথের চিঠি হিন্দু অনুশাসনেরই পক্ষে ছিল। শুধু তাই নয়, সমাজের মাথা হিসাবে ব্রাহ্মণের আলাদা অবস্থানকেও তিনি সমর্থন করেছেন। কিন্তু তাঁর চিন্তা পরে পরিণত হয় এবং পরিবর্তিতও হয়। এই সমস্ত ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম জীবন ও পরবর্তী জীবনের চিন্তার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। নিজেও তিনি তা স্বীকার করেছেন। পরবর্তীকালে তাই ধর্মের বা শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে তিনি কুসংস্কার দূর না করাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের এক পংক্তিতে আহারের এক আসরে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমার লজ্জাবোধ হয় যে, মানুষ মানুষকে ভালবাসবে এই সহজ কথাটি এত শাস্ত্রবচন ও তর্ক দিয়ে আমাদের এই দুর্ভাগা দেশকে এখনও বলতে হয়। হাজার হাজার বৎসর ধরে এদের পেছনে ফেলে রেখেছি, সব দেশকে অন্ধকার মগ্ন করে রেখেছি, আমরা শিক্ষিতেরা। আজ কি তাদের এত করে শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে বলতে হবে?''(৮) তীব্র শ্লেষে তিনি শ্রীনিকেতনের একটি উৎসবে বলেছিলেন, ‘‘যখনই দেশকে আমরা গলা ছেড়ে ‘মা' বলে ডাকি তখন মুখে যাই বলি মনে মনে আমরা জানি সে ‘মা' গুটিকয়েক আদুরে ছেলের ‘মা'। এই করেই কি আমরা বাঁচব?''(৯) সংবাদপত্রের পাতায় যখন দেখা যায় গুজরাটের স্কুলের এক শিশু ছাত্র তার শিক্ষককে জল এনে দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘তুই চামার, যা নিয়ে যা'– তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে আমরা কোথায় চলেছি, সত্যিই কি এভাবে বাঁচব? যখন ‘দলিত' শ্রেণি বলে চলে অত্যাচার এমনকী নির্বিচার নিধনযজ্ঞ– তখন কি মনে হয় আমরা রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা করি? শান্তিনিকেতনে মুসলমান ছাত্র ভর্তি নিয়েও সেদিন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে বহু লড়াই করেই। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় অভিনন্দিত করেছেন এই সাফল্যকে– ‘যেদিন শান্তিনিকেতন মুসলমান খ্রীষ্টানের জন্য দ্বার উন্মোচন করিল সেদিন শান্তিনিকেতনের ইতিহাসে একটা বৃহত্তর জীবনের সূচনা হইল।' অথচ পশ্চিমবঙ্গের সমাজজীবনে ও মানসিকতায় এখনও এই বিভেদ রয়েছে শুধু তাই নয়, হীন রাজনৈতিক স্বার্থে তাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
।। হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ।।
ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলমানের বা নানান ধর্মের মিলনের ঐতিহ্য সম্পর্কে যে কথা বহুল প্রচারিত– মিলনের সঠিক পথ কী তা নিয়ে যখন বিস্তর কথাও উঠছে সমাজ জীবনে, তখন রবীন্দ্রনাথ তারই প্রত্যাশা নিয়ে ‘গোরা'য় বলেছেন, ‘আমাকে আজ সেই দেবতার মন্ত্র দিন, যিনি হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান ব্রাহ্ম সকলেরই– যাঁর মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে, কোনো ব্যক্তির কাছে কোনোদিন অবরুদ্ধ হয় না– যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।' এক্ষেত্রে মানবতাবাদের সুর প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর চিন্তায়– যিনি চেয়েছেন মানববন্ধনে ধর্মের বাঁধনকে যুক্ত না করতে। তাই তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘‘যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাঁধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ।''(১০) সে সর্বনাশ আজ অমরা প্রত্যক্ষ করছি প্রতি দিন, প্রতি মুহূর্তে! একথা সত্য যে আকাঙক্ষা বা আকুতি যতই থাকুক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্বার্থবোধ ছাড়া মেলাতে চাইলেই কি মেলানো যাবে? আমরা জানি, ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশে এই জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কর্মসূচিকে আমরা মেলাতে পারিনি বলে প্রথম থেকেই তা ছিল দুর্বল। একটা সুসংহত জাতি গঠনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে আমরা আমাদের দেশে ধর্মীয় ভাবনা-ধারণা থেকে মুক্ত করতে না পারার জন্য আধুনিক জাতি হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিলেও আমরা বহু ধর্মে, বর্ণে, সম্প্রদায়ে বিভক্ত। স্পষ্টভাবে এই সমস্যার গভীরতা সেদিন সকলের কাছে প্রতীয়মান হয়নি। হিন্দু-মুসলমানের আলাদা সত্তা বা আলাদা ধর্মকে এবং বিভিন্ন উপজাতীয় সত্তা বজায় রেখে সেদিন যে মিলন গড়বার চেষ্টা হয়েছিল– তাতে আন্তরিকতা যাই থাক– বাস্তবে সেদিন সংহত রূপে তা গড়ে ওঠেনি। এই মিলনের নানান প্রচেষ্টার সময়ে রবীন্দ্রনাথ কতকগুলি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‘ধর্মমতে হিন্দুর বাধা প্রবল নয়, আচারে প্রবল; আচারে মুসলমানের বাধা প্রবল নয়, ধর্ম মতে প্রবল। এক পক্ষের যেদিক দ্বার খোলা, অন্যপক্ষের সেদিক দ্বার রুদ্ধ। এরা মিলবে কী করে? ...এই বাধা কেবল হিন্দু-মুসলমানে তা নয়। তোমার আমার মত মানুষ যারা আচারে স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাই আমরাও পৃথক, বাধাগ্রস্ত। সমস্যা তো এই সমাধান কোথায়? মনের পরিবর্তনে, যুগের পরিবর্তনে। য়ুরোপ সত্যসাধনা ও জ্ঞানের ব্যাপ্তির ভিতর দিয়ে যেমন করে মধ্যযুগের ভিতর দিয়ে আধুনিক যুগে এসে পৌঁচেছে, হিন্দু মুসলমানকেও তেমনি গণ্ডির বাইরে যাত্রা করতে হবে। ধর্মকে কবরের মতো তৈরী করে তারই মধ্যে সমগ্র জাতিকে ভূতকালের মধ্যে নিহিত করে রাখলে উন্নতির পথে চলবার উপায় নেই, কারো সঙ্গে কারো মেলবার উপায় নেই। ...শিক্ষার দ্বারা সাধনার দ্বারা সেই মূলের পরিবর্তন ঘটাতে হবে. ...তারপরে আমাদের কল্যাণ হ'তে পারবে। হিন্দু-মুসলমানের মিলন যুগ পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে।''(১১)
।। ধর্মকে অতিক্রম করে জাতিগঠন না করতে পারার ফল ফলে চলেছে স্বাধীন ভারতে ।।
একথা আজ নিঃসংশয়ে আমরা বলতে পারি, আমরা বিগত শতাব্দীর মধ্যভাগে স্বাধীনতা পেয়েছি– অন্তত ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ভারতীয় বুর্জোয়াশ্রেণি রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করেছে– তবু সেই যুগ পরির্বতন আজও অধরাই থেকে গিয়েছে। এমনকী ভারতবর্ষের জীবন, ঐতিহ্য সমস্ত কিছুকেই কেবলমাত্র হিন্দুদের বা আর্যদের বলে আস্ফালন করতে আমরা একদল তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ দ্বিধা করছি না। এঁদের মধ্যে বেশ কিছু রবীন্দ্র উপাসকও আছেন। অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বিশ্বভারতী'-তে বলছেন, ‘‘ভারতবর্ষের কেবল হিন্দু চিত্তকে স্বীকার করলে চলবে না। ভারতবর্ষের সাহিত্য, শিল্পকলা, স্থপতি-বিজ্ঞান প্রভৃতি হিন্দু-মুসলমানের সংমিশ্রণে বিচিত্র সৃষ্টি জেগে উঠেছে তারই পরিচয়।'' যথার্থই হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সাধনাই এদেশের সংস্কৃতির একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সঙ্গীতে, চিত্রে, ভাস্কর্যে, আর্কিটেকচারে– কোথাও মন্দিরের মধ্যে মসজিদের ইসলামী স্থাপত্য, আবার কোথাও মসজিদে যুক্ত মন্দিরের শিল্পরীতি। অথচ বর্তমান ভারতে একদল তাকে অস্বীকার করছে। তারা সুকৌশলে ইতিহাসকে বিকৃত করছে। এরাই যখন রবীন্দ্রপ্রশস্তি গায় তখন তাতে সততার নিদর্শন থাকে না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘‘...আমাদের ভারতবর্ষীয় সঙ্গীত মুসলমানেরও বটে হিন্দুরও বটে, তাহাতে উভয় জাতীয় গুণীরই হাত আছে; ...চিত্র, স্থাপত্য, বস্ত্রবয়ন সূচিশিল্প, ধাতুদ্রব্য নির্মাণ, দম্ভকার্য, নৃত্য, গীত এবং রাজকার্য মুসলমানের আমলে ইহার কোনটাই একমাত্র মুসলমান বা হিন্দুর দ্বারা হয় নাই; উভয়ে পাশাপাশি বসিয়া হইয়াছে। তখন ভারতবর্ষের যে একটি বাহ্যাবরণ নির্মিত হইতেছিল, তাহাতে হিন্দু ও মুসলমান ভারতবর্ষের ডানহাত ও বামহাত হইয়া টানা ও পোড়েন বুনিতেছিল।''(১২) আর আমরা একবিংশ শতাব্দীতে নিজেদের দুই হাতে মারামারি করে নিজের হাত ভেঙ্গেই ধর্মের অহঙ্কারে আস্ফালন করছি। এ মূঢ়তার লজ্জা কি দিয়ে ঢাকব আমরা? বর্তমানে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘বিদেশী' হিসাবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চলছে এদেশে। তথাকথিত হিন্দুত্বের জিগীর তুলে যাঁরা এসব বলছেন তাঁদের কবির আরেকটি উক্তি স্মরণ করতে অনুরোধ করি। সেখানে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘‘মুসলমানরা পুরুষানুক্রমে জন্মিয়া ও মরিয়া এদেশের মাটিকে আপন করিয়া লইল। মুসলমান রাজত্ব ভারতবর্ষেই প্রতিষ্ঠিত ছিল, বাইরে তার মূল ছিল না। তাই মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায় পরস্পর জড়িত হইয়াছিল এবং পরস্পরের আদান-প্রদানের সহস্র পথ ছিল।''(১৩) আজ যখন সেই আদান-প্রদানের পথ রুদ্ধ করতে চলেছে উগ্র ধর্মান্ধতা, তখন তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানানো প্রকৃত অর্থে সম্ভব নয়।
বেশ কিছু দিন ধরে বর্তমানে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন শাসক দল ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে দেশজুড়ে তীব্র মুসলমান বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চাইছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। একদিকে আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত অগ্রগতির বড়াই করছি, অপরদিকে তথাকথিত হিন্দুত্বের উন্মাদনার শিকার হচ্ছি। শাসকদল চেষ্টা করলেও জনমানসে তেমন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারত না– যদি ভারতীয় জাতি এক অখণ্ড জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত বা তা গড়ে উঠত। আমরা আমাদের জাতি গঠনের প্রক্রিয়াতে ধর্মকে বিসর্জন দিতে পারিনি। আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের কর্মসূচিগুলিকেও ধর্ম থেকে বা ধর্মীয় আচাররীতি থেকে মুক্ত করতে পারিনি। বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করে শিবদাস ঘোষ দেখিয়েছেন, ‘‘রিলিজিয়ান থেকে মুক্ত করে আমরা জাতীয়তা এবং জাতীয়তাবোধের নূতন ভাবনা ধারণাগুলিকে সামনে নিয়ে আসতে পারলাম না। ফলে জাতীয়তাবাদ মূলতঃ ‘রিলিজিয়ান ওরিয়েণ্টেড' ন্যাশনালিজম (ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ) হয়ে পড়ল এবং এই অবস্থায় অতি স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনে হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য থেকে গেল। স্বাধীনতা আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিলেন, গণতান্ত্রিক ভাবনা ধারণার কথা তাঁরা যত সুন্দর করেই বলুন না কেন, এই কারণেই ভারতবর্ষের মুসলমানদের তা স্পর্শ করতে পারল না। ...শুধু কি তাই? আমরা হিন্দু সমাজের কাস্টিজমকেও (জাতপাতকেও) দূর করতে পারলাম না।''(১৪) ঘটনার সত্যতার কিছু আভাস ধরা পড়েছিল কবির চিন্তায় ও দৃষ্টিতে। তিনি বলেছেন, ‘‘আমাদের দেশে যখন স্বদেশী আন্দোলন উপস্থিত হয়েছিল, তখন আমি তার মধ্যে ছিলাম। মুসলমানরা তাতে যোগ দেয়নি, বিরুদ্ধে ছিল। জননায়করা কেউ কেউ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ওদের একেবারে অস্বীকার করা যাক। জানি ওরা যোগ দেয়নি, কিন্তু কেন দেয়নি? তখন বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এত প্রবল যোগ হয়েছিল যে সে আশ্চর্য। কিন্তু এত বড়ো আবেগ শুধু হিন্দু সমাজের মধ্যেই আবদ্ধ রইল, মুসলমান সমাজকে স্পর্শ করল না। সে দিনও আমাদের শিক্ষা হয়নি।''(১৬)
যদিও একথা ঠিক রবীন্দ্রনাথ জীবনের প্রথমদিকে একদিকে কিছু ক্ষেত্রে ঠাকুর পরিবার থেকে যেমন সংস্কারমুক্তির শিক্ষা পেয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন সংস্কারগ্রস্ত কিছু চিন্তাও। দেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রাচীন প্রথাগুলির প্রতি রবীন্দ্রনাথের বিরাগ প্রথম জীবন থেকেই ছিল না। ঠাকুর পরিবারে থেকে বৃহত্তর সমাজে মেলামেশার সুযোগ কম ছিল। একটা সময় পর্যন্ত তাই তিনি এসব প্রশ্নে সকল ক্ষেত্রে সঠিক অবস্থান গ্রহণ করেননি। ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত। এমনকী তিনি এও বলেছেন, ‘‘বর্তমান সমাজেরও যদি একটা মাথার দরকার থাকে, সেই মাথাকে যদি উন্নত করিতে হয় এবং সেই মাথাকে যদি ব্রাহ্মণ বলিয়া গণ্য করা যায় তবে স্কন্ধ বা গ্রীবাকে একেবারে মাটির সমান করিয়া রাখিলে চলিবে না। সমাজ উন্নত না হইলে তাহার মাথা উন্নত হয় না এবং সর্বপ্রযত্নে উন্নত করিয়া রাখাই সেই মাথার কাজ।''(১৫) কিন্তু পরবর্তীকালে পরিণত চিন্তায় এই ধরনের চিন্তাভাবনার পরিবর্তে বহু বাস্তব চিত্র ধরা পড়েছিল তাঁর দৃষ্টিতে। জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘‘আমি যখন প্রথম আমাদের জমিদারি কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলুম তখন দেখেছিলুম, কাছারিতে মুসলমান প্রজাকে বসতে দিলে জাজিমের এক প্রান্ত তুলে দিয়ে সেই স্থানে তাকে স্থান দেওয়া হত।''(১৭) বলেছেন, ‘‘জাজিম তোলা আসনে মুসলমান বসেছে, জাজিম পাতা আসনে অন্যে বসেছে। তারপর ওদের ডেকে একদিন বলেছি, ‘আমরা ভাই, তোমাকেও আমার সঙ্গে ক্ষতি স্বীকার করতে হবে, কারাবাস ও মৃত্যুর পথে চলতে হবে। তখন হঠাৎ দেখি অপরপক্ষ লাল টকটকে নতুন ফেজ মাথায় দিয়ে বলে, ‘আমরা পৃথক।' আমরা বিস্মিত হয়ে বলি, রাষ্ট্র ব্যাপারে পরস্পর পাশে এসে দাঁড়াবার বাধাটা কোথায়? বাধা ওই জাজিম তোলা আসনে, বহুদিনের মস্ত ফাঁকটার মধ্যে।''(১৮) তাঁর এই স্বীকারোক্তি রাজনৈতিক আন্দোলনের অনেকের কাছে সেদিন স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়নি। এই ভেদ-বিভেদের প্রশ্নে সংখ্যাগরিষ্ঠের দায়িত্ববোধকেও তুলে ধরেছেন, ‘‘...আমি হিন্দুর তরফ থেকেই বলছি, মুসলমানের ত্রুটি বিচারটা থাক্– আমরা মুসলমানকে কাছে টানতে যদি না পেরে থাকি তবে সেজন্য লজ্জা স্বীকার করি।''(১৯) এই শিক্ষা আমরা স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে এখনও গ্রহণ করতে পারিনি– একথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
।। সনাতন ঐতিহ্যের প্রশ্নটি বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যথার্থই মানবতাবাদী ।।
একথা ঠিক রবীন্দ্রনাথ হিন্দুত্বকে একটা জীবনধারা– যা ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে– বলে স্বীকার করতেন– প্রাচীন ভারতের বহু গৌরবোজ্জ্বল বিষয়কে হিন্দুত্বের ধারা বা ভারতীয় ধারা হিসাবে গৌরবের সঙ্গে বিচার করেছেন। কথার দিক থেকে তা আজ কেন্দ্রের শাসককুলকে সাহায্য করছে ঠিকই। কিন্তু তারা যেভাবে এবং যে অর্থে তা ব্যবহার করছে তা কবির ইচ্ছা বা চিন্তার পরিপন্থী। তথাকথিত এই হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা তাদের হীনস্বার্থে তাকে কাজে লাগাচ্ছে। এক্ষেত্রে যারা যথার্থ রবীন্দ্র অনুরাগী তাদের তুলে ধরতে হবে বিষয়গুলি সম্পর্কে তাঁর পূর্ণাবয়ব চিন্তাকে। এই কাজটি আজ খুবই জরুরী। একটু বিচার করলেই আমরা দেখতে পাব, সনাতন ঐতিহ্যের প্রশ্নটি শুধুমাত্র বাদ দিলে তিনি এ প্রসঙ্গে যে কথাকে তুলে ধরেছেন তা বাস্তবিকই বর্তমান সময়ে সকল ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবাপন্ন মানুষেরও প্রণিধানযোগ্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হিন্দুধর্ম নিয়ে বর্তমানে দেশে যে উন্মাদনা চলছে সে প্রসঙ্গে হিন্দুধর্মের প্রবক্তা বিবেকানন্দেরই একটি অসামান্য উক্তি। তিনি বলেছিলেন, ‘‘পূর্বকালে ‘হিন্দু' শব্দে সিন্ধু নদের অপর তীরের (পূর্বতীরের) অধিবাসীগণকে বুঝাইত। তখন ওই শব্দের একটা সার্থকতা ছিল। কিন্তু এখন ইহা নিরর্থক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ঐ শব্দের দ্বারা এখন বর্তমান হিন্দুজাতি বা ধর্ম কিছুই বুঝাইতে পারে না। কারণ সিন্ধুনদের পূর্বদিকে এখন নানা ধর্মাবলম্বী নানা জাতীয় লোক বাস করে।''(২০) অথচ এই ‘হিন্দুধর্ম' নিয়ে তার ‘মহিমা' প্রচার চলছে নতুন করে এবং তার দ্বারা অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হচ্ছে। যদিও একথা সত্য যে, তার মধ্যে ‘ধর্ম' বা ধর্মীয় মূল্যবোধ বলতে কিছু নেই। আমরা জানি, স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে হিন্দুধর্মকে সকল ধর্মের মিলন স্থল হিসাবে মহিমান্বিত করা এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সাথে তাকে একাত্ম করার প্রবল প্রচেষ্টা ছিল আমাদের দেশে। সেইরকম একটি পরিস্থিতিতেও হিন্দুধর্মকে সমস্ত ধর্মমতের মিলনস্থল হিসাবে মহিমান্বিত করার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ বলিষ্ঠভাবে বলেছিলেন, ‘‘ভারতবর্ষে গ্রীক পারসিক শক নানা জাতির অবাধ সমাগম ও সম্মিলন ছিল। কিন্তু মনে রেখো, সে ‘হিন্দু' যুগের পূর্ববর্তীকালে। হিন্দুযুগ হচ্ছে একটা প্রতিক্রিয়ার যুগ– এই যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মকে সচেষ্টভাবে পাকা করে গাঁথা হয়েছিল। দুর্লঙ্ঘ আচারের প্রাকার তুলে একে দুষ্প্রবেশ করে তোলা হয়েছিল। ...এর প্রকৃতিই হচ্ছে নিষেধ এবং প্রত্যাখ্যান। সকল প্রকার মিলনের পক্ষে এমন সুনিপুণ কৌশলে রচিত বাধা জগতে আর কোথাও সৃষ্টি হয়নি।''(২১) প্রসঙ্গত, ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনের হিন্দুধর্ম যে ভারতের অতীত ঐতিহ্য এবং গৌরবের কত ক্ষতিসাধন করেছে তার ইতিহাসও সকলের অজানা নয়। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ‘মনু' কথিত হিন্দুধর্ম এবং শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ প্রাচীন ভারতের গৌরবকে কিভাবে কালিমালিপ্ত করেছে তা খুব স্পষ্ট করেই তুলে ধরেছেন তাঁর ‘‘হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি' গ্রন্থে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘মনু ও পরবর্তী পুরাণগুলির ঝোঁক হ'ল দাম্ভিক পুরোহিত শ্রেণীকে মহিমান্বিত করার দিকে। সুশ্রুতের মতে শবব্যবচ্ছেদ শল্যচিকিৎসার ছাত্রের পক্ষে অপরিহার্য্য ...কিন্তু মনু এসব বরদাস্ত করতে রাজী নন। ...হিন্দু সমাজ – যা কিনা স্বভাবতই জল্পনা ও অধিবিদ্যাপ্রবণ – অনুসন্ধিৎসার উদ্দীপনা এবং সেই সঙ্গে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানকে বিদায় জানালো। ভারতবর্ষের জমি একজন বয়েল, দেকার্ত বা নিউটনের জন্ম দেওয়ার যোগ্যতা হারালো। আর সেই সঙ্গে তার নাম পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসলো।''(৪৮) প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ডঃ মেঘনাদ সাহা হিন্দুধর্মের জাতিভেদ নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘‘আমার মতে এই জাতিভেদ প্রথা হস্ত ও মস্তিষ্কের মধ্যে যোগসূত্রকে সম্পূর্ণ ছিন্ন করিয়া দিয়াছে এবং সেইজন্য ভারতের বস্তুতান্ত্রিক সভ্যতা ইউরোপ আমেরিকার বহু পশ্চাতে পড়িয়া রহিয়াছে।''(৪৯) যে শঙ্করাচার্যকে হিন্দুধর্মে প্রায় ‘ভগবান' বলেই মনে করা হ'ত, তাঁর সম্পর্কেও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছেন, ‘‘বেদান্তদর্শন, শঙ্কর দ্বারা পরিবর্তিত ও পরিবর্দ্ধিত রূপে যা জগতের অসত্তা প্রচার করে, প্রকৃতিবিজ্ঞান চর্চার প্রতি অশ্রদ্ধার উদ্রেকে তা বিরাট ভুমিকা পালন করেছে।''(৪৮)
বর্তমান সময়ের উন্মাদনা সৃষ্টির প্রচেষ্টায় এই ঐতিহাসিক সত্যগুলি হারিয়ে যেতে বসেছে। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে কবিকে স্মরণ করতে গিয়ে আমরা তাঁর শিক্ষাকে কতটা উপলব্ধি করতে পারব এবং বৃহত্তর জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে পারব, তা আমাদের প্রত্যেকের কাছেই বিচার্য বিষয়। এ কাজের ঝঞ্ঝাট আছে, শাসককুলের বিষনজরে পড়বার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই একদল রবীন্দ্রভক্ত রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্যগুলিকে তুলে না ধরে নানান বাক্যবিন্যাসে তাঁদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। এর দ্বারা রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন কোনওভাবেই সম্ভব নয়।
হিন্দুত্বের সঙ্গে সনাতন ঐতিহ্যের প্রশ্ন তিনি কোথাও কোথাও যুক্ত করেছেন একথা যেমন ঠিক, তেমনি সেই সনাতনী ঐতিহ্যকেই তিনি সব সময় অন্ধভাবে সমর্থনও করেননি। ধর্মীয় প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত না হওয়ার জন্য যেমন কিছু চিন্তা অস্পষ্টভাবে তাঁর মধ্যে ধরা দিলেও তার জন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপে কোথাও কোথাও দ্বিধাগ্রস্ততা দেখা দিয়েছে, কিন্তু পাশাপাশি মানবতাবাদের উপাসক হওয়ার জন্য এবং তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি ও বহুমুখী প্রতিভার কারণে বহু জিনিস ধরাও পড়েছে সূক্ষ্মভাবে। এমনকি জাতপাতের প্রশ্নে তদানীন্তন কংগ্রেসকেও তিনি সমালোচনা করেছেন। একথা আমরা জানি তদানীন্তন কংগ্রেস নেতৃত্ব, যাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন মূলত বর্ণহিন্দু এবং আমরা এও জানি এর প্রতিক্রিয়ায় সেদিন কংগ্রেসী নেতৃত্বের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশনও গঠিত হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে কিছু মহৎ মানুষ বাদ দিলে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব হিন্দু সংস্কারের ঊর্দ্ধে ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ সেই প্রশ্নে এক চিঠিতে বলেছেন, ‘‘যেখানে শত্রুরাও মেলবার অধিকার রাখে, হিন্দুরা সেখানেও মিলতে পারে না। এই মর্মান্তিক বিচ্ছেদে হিন্দুরা পদে পদে পরাভূত। ...মানুষকে হিন্দুসমাজ অবমাননার দ্বারা দূর করে দিয়েছে, সকলের চেয়ে লজ্জার বিষয় এই যে সেই অবমাননা ধর্মের নামেই। ...বিদেশী যারা বাহির থেকে আমাদের হাতে হাতকড়ি লাগিয়েছে। ভিতর থেকে হিন্দুরা নিজের হাতে আরও বেশি কড়া শিকল এঁটে দিয়ে সেই শিকলকে ফুলচন্দন দিয়ে পূজো করছে। আমাদের এই দুর্ভাগ্য নিয়ে কংগ্রেস সাহস করে সমালোচনা করেনি– মহাত্মাজি প্রভৃতি দুই-একজন ব্যক্তিগতভাবে করে থাকবেন। কংগ্রেসের এই ভীরুতা তার কর্তব্য বিরুদ্ধ।''(২২)
বর্তমানে গোহত্যা, গোমাংস নিয়ে আবার দেখা দিয়েছে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক উস্কানি। গো-রক্ষার নামে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের উপর নেমে আসছে পৈশাচিক আক্রমণ। ইতিমধ্যে, এ কথা স্পষ্ট যে, পুঁজিবাদের চূড়ান্ত শোষণ থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার জন্যই শাসক দল এই সব হীন কাজ করে চলেছে ‘হিন্দু ধর্ম রক্ষা'র নামে। প্রসঙ্গত, মনে পড়ে ইতিহাসের কিছু কথা। ‘গোহত্যা' নিবারণী সভার এক সদস্য স্বামী বিবেকানন্দের কাছে গিয়ে একবার বলেছিলেন, ‘গো আমাদের মাতা, তাকে রক্ষা করতে হবে'– তার প্রতি হিন্দুধর্মের প্রবক্তা বিবেকানন্দের বিখ্যাত উক্তি– ‘তা না হলে এমন সব কৃতীসন্তান আর কে প্রসব করবেন?'(২৩) এই সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে স্পষ্ট এবং বলিষ্ঠ বক্তব্য উপস্থিত করেছিলেন তা যথার্থই আমাদের অনুপ্রাণিত করে। একথা আমরা সকলেই জানি ১৮৯৩ সালে বাল গঙ্গাধর তিলক হিন্দু জাতীয়তাবোধকে সুদৃঢ় করবার জন্য ‘গোরক্ষা সভা' প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি উন্মাদনা সৃষ্টির জন্য নয়, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে হিন্দুধর্মকে মিশিয়ে ছিলেন বলেই তা করেছিলেন। কিন্তু তার ফলশ্রুতিতে মুসলমান সম্প্রদায় পুণা কংগ্রেস বয়কট করে। শুধু তাই নয়, গো-হত্যাকে কেন্দ্র করে বোম্বেতে, বিহারে, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ১৯১৭ সালে বিহারে এই বিষয়কে কেন্দ্র করে যে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা হয়েছিল, তাতে উদ্বেগ বোধ করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‘বিশেষ শাস্ত্রমতের অনুশাসনে বিশেষ করিয়া যদি কেবল বিশেষ পশুহত্যা না করাকেই ধর্ম বলা যায়, এবং সেইটে জোর করিয়া অন্য ধর্মমতের মানুষকেও মানাইতে চেষ্টা করা হয়, তবে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ কোন কালেই মিটিতে পারে না। নিজে ধর্মের নামে পশুহত্যা করিব– অথচ অন্যে ধর্মের নামে পশুহত্যা করিলেই নরহত্যার আয়োজন করিতে থাকিব, ইহাকে অত্যাচার ছাড়া আর কোন নাম দেওয়া যায় না।''(২৪) ‘ঘরে বাইরে' উপন্যাসে আরও স্পষ্ট করে তিনি বলেছেন, ‘‘...এদেশে মহিষও দুধ দেয়, মহিষেও চাষ করে, কিন্তু তার কাটামুণ্ড মাথায় নিয়ে সর্বাঙ্গে রক্ত মেখে যখন উঠোনময় নৃত্য করে বেড়াই, তখন ধর্মের দোহাই দিয়ে মুসলমানের সঙ্গে ঝগড়া করলে ধর্ম মনে মনে হাসেন, কেবল ঝগড়াটাই প্রবল হয়ে ওঠে। কেবল গরুই যদি অবধ্য হয় আর মোষ যদি অবধ্য না হয়, তবে ওটা ধর্ম নয়। ওটা অন্ধ সংস্কার।(২৫) কথাগুলি বাস্তবিকই মনে হয় যেন বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কবি স্বাধীনোত্তর ভারতের জনগণের কাছে বলছেন। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে, যাঁরা বর্তমানে রবীন্দ্রসাহিত্য ব্যাখ্যা করছেন তাঁদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্যগুলি তুলে ধরে বর্তমান সময়ের সমস্যার বিরুদ্ধে জনমতকে প্রভাবিত করার কাজটি করছেন না।
।। ধর্মীয় সংস্কার আর অনুশাসনকে
রবীন্দ্রনাথ প্রশ্রয় দেননি ।।
ধর্মের অনুশাসন বা ধর্মীয় সংস্কারকে কবি সাধারণত প্রশ্রয় দেননি। বিজ্ঞান ও যুক্তির প্রতি তাঁর অনুসন্ধিৎসু মনের আস্থা ছিল প্রগাঢ়। যদিও একথা সত্য যে, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানচেতনার স্বীকৃতি দিলেও, তিনি সমস্ত প্রশ্নে বিজ্ঞানসম্মত ধারণায় স্থির ছিলেন না। বিজ্ঞানের পথে চলতে চলতে কখনও কখনও তিনি পূর্বস্থিরীকৃত ধারণা বা অতীন্দ্রিয়বাদের পথপরিক্রমাতেও জড়িয়ে পড়েছেন। প্রকৃতপক্ষে কবির স্থির বিশ্বাস ছিল মানুষের নৈতিকতার শাশ্বত একটা রূপ আছে, মূল্যবোধ পূর্বনির্ধারিত এবং সেই মূল্যবোধ ভাববাদ থেকে উৎসারিত। এবং এ প্রশ্নে তিনি ছিলেন এক ব্রহ্ম উপাসক। পরিবর্তনকে তিনি যথার্থই মানতেন, কিন্তু মূল্যবোধের প্রশ্নে চিরন্তনের প্রশ্নটি ছিল তার সাথে মিশে। বিশেষ করে আত্মোপলব্ধির প্রশ্নে। এইটিই দ্বৈতসত্তা। গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি মানবতাবাদী চিন্তা ও মূল্যবোধের সুরকে – সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার শ্লোগানকে ভিত্তি করে এবং মানুষকে কেন্দ্র করে মানবতার ধারণাকে ধ্বনিত করেছেন – আবার তারই সাথে খুব সূক্ষ্মভাবে তাঁর চিন্তায় ঘটেছে ভারতীয় ঐতিহ্যবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সংমিশ্রণ। তবে তা কখনই ধর্মান্ধতার পর্যায়ে ছিল না। তিনি ধর্ম বলতে মূলত কতকগুলি মানবিক মূল্যবোধ, মানবকল্যাণমুখী কতকগুলি নৈতিক চেতনাকেই দেখাতে চেয়েছেন। তাই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘‘ধর্ম আর ধর্মতন্ত্র এক জিনিস নয়। ও যেন আগুন আর ছাই। ধর্মতন্ত্রের কাছে ধর্ম যখন খাটো হয় তখন নদীর বালি নদীর জলের উপর মোড়লি করিতে থাকে। ...ধর্ম বলে, মানুষকে যদি শ্রদ্ধা না কর তবে অপমানিত ও অপমানকারী কারও কল্যাণ হয় না। কিন্তু ধর্মতন্ত্র বলে, মানুষকে নির্দয়ভাবে অশ্রদ্ধা করিবার বিস্তারিত নিয়মাবলী যদি নিখুঁত করিয়া না মান তবে ধর্মভ্রষ্ট হইবে। ধর্ম বলে জীবকে নিরর্থক কষ্ট যে দেয়, সে আত্মাকে হনন করে। কিন্ত ধর্মতন্ত্র বলে, যত অসহ্য কষ্টই হউক, বিধবা মেয়ের মুখে যে বাপ-মা বিশেষ তিথিতে অন্নজল তুলিয়া দেয়, সে পাপকে লালন করে। ধর্ম বলে, অনুশোচনা ও কল্যাণকর্মের দ্বারা অন্তরে বাহিরে পাপের শোধন। কিন্তু ধর্মতন্ত্র বলে গ্রহণের দিনে বিশেষ জলে ডুব দিলে, কেবল নিজের নয়, চোদ্দ পুরুষের পাপ উদ্ধার। ধর্ম বলে সাগরগিরি পার হইয়া পৃথিবীটাকে দেখিয়া লও, তাতেই মনের বিকাশ। ধর্মতন্ত্র বলে, সমুদ্র যদি পারাপার কর তবে খুব লম্বা করিয়া নাকে খত দিতে হইবে। ধর্ম বলে যে মানুষ যথার্থ মানুষ সে যে ঘরেই জন্মাক, পূজনীয়। ধর্মতন্ত্র বলে, যে মানুষ ব্রাহ্মণ সে যত বড়ো অভাজনই হোক, মাথায় পা তুলিবার যোগ্য। অর্থাৎ মুক্তির মন্ত্র পড়ে ধর্ম, আর দাসত্বের মন্ত্র পড়ে ধর্মতন্ত্র।''(২৬) এরই পাশাপাশি তিনি দেখিয়েছেন, ‘‘যে সমাজ দৈবগুরু ও অপ্রাকৃত প্রভাবের 'পরে আস্থাবান নয়, যে সমাজ বুদ্ধিকে বিশ্বাস করতে শিখেছে, সে সমাজে পরস্পরের উৎসাহে ও সহায়তায় মানুষের মনের শক্তি সহজেই নিরলস থাকে।''(২৭) চিন্তার এই ধারা বা প্রক্রিয়ার জন্যই তিনি ধর্মকে কখনও ব্যক্তির বাইরে নিয়ে যান নি। পরম ব্রহ্মে বিশ্বাসী ও উপনিষদের প্রতি তিনি আস্থাশীল ছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন মূলত সংস্কারমুক্ত। তাঁর সত্যাশ্রয়ী মন ও চেতনার বিশিষ্ট দিকগুলিকে অনুধাবন করা এবং সেগুলিকে জনমানসে তুলে ধরার কাজটিকে ঠিকমত করতে পারলে, অনেক রবীন্দ্রভক্ত যেভাবে জেনে বা না জেনে তাঁকে অতীন্দ্র়িয়লোকে স্থাপন করে সেই ভ্রান্তির হাত থেকে আমরা মুক্তি পাব।
।। বিজ্ঞান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা ।।
প্রকৃত রবীন্দ্র অনুরাগী হয়ে জীবনদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথকে উপলব্ধি করার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করলেই আমরা দেখতে পাব কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর বিজ্ঞান চেতনা বা বিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণার দিকটি কত প্রবল ছিল। দেখতে পাব, রাষ্ট্রের প্রশ্নে, এবং বিশেষ করে শিক্ষার প্রশ্নে তাঁর ইহজগতমুখী চিন্তার ব্যাপকতা। তিনি বলছেন, ‘‘বুদ্ধিকে মোহমুক্ত ও সতর্ক করার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার।''(২৮) ...‘‘মানুষের পক্ষে বিজ্ঞানের খুব বড়ো একটা তাৎপর্য আছে। প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে মানুষের জ্ঞানের সহযোগিতা আছে। বিজ্ঞান ইহাই প্রমাণ করে। প্রকৃতির নিয়মের সাহায্যেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের অধীনতা কাটাইয়া মানুষ আপন ধর্মবিবেকের স্বাধীন নির্বাচনের গৌরবলাভ করিতে পারে, ইহাই বিজ্ঞানের শিক্ষা।''(২৯)
আমরা রবীন্দ্রনাথের চিন্তার যে বৈচিত্র্য পাই– বিশেষ করে শিক্ষাবিদ হিসাবে শিক্ষার পাঠ্যক্রম, পঠনপাঠন পদ্ধতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে ধর্মশাসন, মন্ত্রতন্ত্র, কুসংস্কার, অলৌকিকতাকে পরিহার করেছেন– তা যথার্থই বর্তমান দিনেও প্রণিধানযোগ্য এবং তাঁর বক্তব্যের মর্মবস্তু যুগের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়নের ভিত্তিতে অনুসরণযোগ্যও। তিনি বলেছেন, ‘‘বিজ্ঞানের সাথে শাস্ত্রবাক্যের বিরোধ যেখানে, সেখানে শাস্ত্র আজ পরাভূত। বিজ্ঞান আজ আপন স্বতন্ত্র বেদিতে একেশ্বররূপে প্রতিষ্ঠিত। ভূগোল, ইতিহাস প্রভৃতি– মানুষের অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয় বৈজ্ঞানিক যুক্তিপদ্ধতির অনুগত হয়ে ধর্মশাস্ত্রের বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েছে। বিশ্বের সমস্ত জ্ঞাতব্য ও মন্তব্য বিষয় সম্বন্ধে মানুষের জিজ্ঞাসার প্রবণতা আজ বৈজ্ঞানিক। আপ্তবাক্যের মোহ তার কেটে গেছে।''(৩০) আমাদের দেশে শিক্ষার প্রশ্নে অনেকেই ধর্মের প্রশ্নকে যুক্ত করতে চান। অতীতেও যেমন ছিল– বর্তমানেও একদল বিভ্রান্ত হয়ে এবং আর একদল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ধর্মীয় শিক্ষার উপর জোর দেন। রবীন্দ্রনাথ সেই যুগে দাঁড়িয়েই তার বিরোধিতা করেছেন। ভারতের সনাতন ঐতিহ্যের প্রতি গভীর আস্থা থাকা সত্ত্বেও তিনি বলেছেন, ‘‘ঐতিহাসিক তপোবনের কথা আমি জানিনে। কেউ জানে বলে আমি বিশ্বাস করিনে। তপোবনের কথার উল্লেখ আছে পুরাণে। কিন্তু এত অসম্ভব, অলৌকিক অতিপ্রাকৃত কাহিনীর সঙ্গে সে জড়িত যে তাকে ঐতিহাসিক সত্য বলে বিশ্বাস করতে কাউকে অনুরোধ করিনে।''(৩১) প্রাচীন ভারতের গৌরবকে সামনে রেখে ধর্মীয় অন্ধতা, গোঁড়ামি ও কুসংস্কারকে শিক্ষার সিলেবাসে ঢুকিয়ে শিক্ষাকে তেমন করে সাজানোর চেষ্টা চলছে দেশ জুড়ে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার সর্বনাশ সাধনের জন্য শাসককূলের এই অপচেষ্টা। প্রাচীন ঐতিহ্য নয় – তার নাম করে আধুনিক যুক্তি ও বিজ্ঞানকে সমাধিস্থ করাই বর্তমান শাসকশ্রেণীর মূল উদ্দেশ্য। কারণ যথার্থ জ্ঞানসাধনায় তাদের শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার পরিপন্থী। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘‘আমাদের সমাজ আমাদের কালের উপযোগী শিক্ষা দিতেছে না, আমাদিগকে দুই চারি হাজার বৎসর পূর্বকালের শিক্ষা দিতেছে। অতএব মানুষ করিয়া তুলিবার পক্ষে সকলের চেয়ে যে বড়ো বিদ্যালয় সেটা আমাদের বন্ধ।''(৩২) তীব্র শ্লেষে এ প্রশ্ন তিনি সেদিন তাঁর ‘কালান্তর' প্রবন্ধে তুলেছেন, ‘‘আজকের দিনে দেশের লোকেরা, যুবকেরা পর্যন্ত যে বলছে যে, ঋষিরা যা করে গেছেন তার উপরে আর আমাদের কিছুই ভাববার নেই, কিছুই করবার নেই,– এর মানে বুঝতে পেরেছো ?... যে সমাজে কিছুই ভাববার নেই, কিছুই করবার নেই, সমস্তই ধরা বাঁধা, সে সমাজ কি বুদ্ধিমান, শক্তিমান মানুষের বাসের যোগ্য ?'' ভারতবর্ষীয় মানসিকতার সনাতনপন্থাকে অনেক ক্ষেত্রে তিনি আঘাত করেছেন। বলেছেন, ‘‘জগতে আর সর্বত্রই অভিব্যক্তির নিয়ম কাজ করিয়া আসিয়াছে; কেবল ভারতবর্ষেই সে প্রবেশ করিতে পারে নাই। এখানে সবই অনাদি এবং ইতিহাসের অতীত। এখানে কোন দেবতা ব্যাকরণ, কোন দেবতা রসায়ন, কোন দেবতা আয়ুর্বেদ আস্ত সৃষ্টি করিয়াছেন –কোন দেবতার মুখ, হস্ত, পদ হইতে একেবারেই চারিবর্ণ বাহির হইয়া আসিয়াছে – সমস্তই ঋষি ও দেবতায় মিলিয়া এক মুহূর্তে খাড়া করিয়া দিয়াছেন। ....আমাদের সামাজিক আচার ব্যবহারেও বুদ্ধিবিচারের কোন অধিকার নেই ....কেননা কার্যকারণের নিয়ম বিশ্বব্রহ্মান্ডে কেবলমাত্র ভারতবর্ষেই খাটিবে না – সকল কারণ শাস্ত্র বচনের মধ্যে নিহিত।''(৩৩)
আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির প্রায় সমস্ত কিছুকেই প্রাচীন, সনাতন, বৈদিক ভারতবর্ষের অবদান হিসাবে সনাক্ত করার যে কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত হাস্যোদ্দীপক প্রবণতা আজও বহু মানুষের মধ্যে এমনকি শিক্ষিত সম্প্রদায়েরও একাংশের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়, তাকে সেই সময়ই দ্বিধাহীন চিত্তে কষাঘাত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ‘প্রত্নতত্ত্ব' প্রবন্ধে ‘প্রাচীন ভারতে গ্যালভানিক ব্যাটারি ছিল কিনা ও অি'জেন বাষ্পের কি নাম ছিল' এবং ‘আর্য-অনার্য' নাটকে ‘সবই ম্যাগনেটিজম' – এ জাতীয় শ্লেষাত্মক রচনার মাধ্যমে যেভাবে তিনি মানুষের যুক্তিহীন মানসিকতাকে আঘাত করেছিলেন তাতে তাঁর ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্ত মনের পরিচয় পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ে এগুলি আমাদের প্রণিধানযোগ্য।
ধর্মাচার্যদের হাত থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি সরাসরি বলেছেন, ‘‘....ইতিহাসে দেখা গিয়াছে যে, একদিন যে ধর্মসম্প্রদায় দেশের বিদ্যাকে পালন করিয়া আসিয়াছে পরে তাহারাই সে বিদ্যাকে বাধা দেওয়ার প্রধান হেতু হইয়া উঠিল।''(৩৪) একদল তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি, যাঁরা মুখে যা বলেন ব্যক্তিজীবনে তা করেন না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কুসংস্কারের শিকার হ'ন, তাঁদেরকেও সতর্ক করে দিয়ে কবি বলেছেন, ‘‘সায়েন্সে ডিগ্রীধারী পণ্ডিত এদেশে বিস্তর আছে, যাদের মনের মধ্যে সায়েন্সের জমিনটা তলতলে। তাড়াতাড়ি যা-তা বিশ্বাস করতে তাদের অসাধারণ আগ্রহ, মেকি সায়েন্সের মন্ত্র পড়িয়ে অন্ধসংস্কারকে তারা সায়েন্সের জাতে তুলতে কুণ্ঠিত হয় না।''(৩৫) এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েট রাশিয়ার ব্যবস্থা দেখে শুধু মুগ্ধই হননি, রাশিয়ায় যাওয়াকে কবি নিজে তীর্থস্থান দর্শনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্পষ্টভাবে এবং খুবই প্রত্যয়ের সাথে তাঁর নানা অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। কবির ধর্মভাবনার ক্ষেত্রেও সেটা একটা উত্তরণ বলেই আমরা মনে করি। দ্বিধাহীন চিত্তে, এমনকি তাঁর কিছু শুভানুধ্যায়ীদের বাধা অগ্রাহ্য করে তিনি বলেছেন, ‘‘যে পুরাতন ধর্মতন্ত্র ও পুরাতন রাষ্ট্রতন্ত্র বহু শতাব্দী ধরে এদের বুদ্ধিকে অভিভূত, প্রাণশক্তিকে নিঃশেষপ্রায় করে দিয়েছে, এই সোভিয়েট বিপ্লবীরা তাদের দুটোকেই দিয়েছে নির্মূল করে। ...যে ধর্ম মূঢ়তাকে বাহন করে মানুষের চিত্তের স্বাধীনতা নষ্ট করে, কোন রাজাও তার চেয়ে আমাদের বড় শত্রু হতে পারে না।– সে রাজা বাইরে থেকে প্রজাদের স্বাধীনতাকে যতই নিগঢ়বদ্ধ করুক না। এ পর্যন্ত দেখা গেছে যে রাজা প্রজাকে দাস করে রাখতে চেয়েছে সে রাজার প্রধান সহায় সেই ধর্ম যা মানুষকে অন্ধ করে রাখে। সে ধর্ম বিষকন্যার মতো, আলিঙ্গন করে, সে মুগ্ধ করে, মুগ্ধ ক'রে সে মারে। শক্তিশেলের চেয়ে ভক্তিশেল গভীরতর মর্মে গিয়ে প্রবেশ করে, কেননা তার মার আরামের মার। ... ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো। রাশিয়ার বুকের পরে ধর্ম ও অত্যাচারী রাজার পাথর চাপা ছিল; দেশের উপর থেকে সেই পাথর নড়ে যাওয়ায় কী প্রচণ্ড নিষ্কৃতি পেয়েছে এখানে এলে সেটা দেখতে পেতে।''(৩৬) পুঁজিবাদী সভ্যতার পঙ্কিল অবস্থার পাশে সমাজতন্ত্র যে কতখানি উৎকর্ষতার নজির রেখেছিল এই পৃথিবীর বুকে তা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার বিষয়। ধর্মীয় উন্মাদনাকে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণি যে কাজে লাগায়, তা বহু মানবতাবাদীর চোখেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
।। সামাজিক পটপরিবর্তন ও ধর্ম প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ।।
বিজ্ঞান সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে তাঁর গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বিক্ষিপ্ত হলেও বেশ কিছু নজির আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সমস্ত ঘটনার উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। তবে সামাজিক পটপরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি মানবতাবাদী বিপ্লবের প্রশ্নে যথাযথভাবেই ধর্ম তথা চার্চতন্ত্রের প্রভাব থেকে মুক্তির দাবিকে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘‘ইতিহাসে বারে বারে দেখা গেছে, যখন কোন মহাজাতি নবজীবনের প্রেরণায় রাষ্ট্রবিপ্লব প্রবর্তন করেছে তার সঙ্গে সঙ্গে প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার ধর্মবিদ্বেষ। দেড়শত বৎসর পূর্বকার ফরাসি বিপ্লবে তার দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। সোভিয়েট রাশিয়া প্রচলিত ধর্মতন্ত্রের বিরুদ্ধে বদ্ধপরিকর। সম্প্রতি স্পেনেও এই ধর্মহননের আগুন উদ্দীপ্ত। মেক্সিকোয় বিদ্রোহ বারে বারে রোমক চার্চকে আঘাত করতে উদ্যত। নব্য তুর্কি যদিও প্রচলিত ধর্মকে উন্মূলিত করেনি কিন্তু বলপূর্বক তার শক্তি হ্রাস করেছে।''(৩৭) তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘‘ধর্মের নাম দিয়ে পৃথিবীতে নিদারুণ উপদ্রব ঘটেছে এমন বৈষয়িক লোভে তাগিদেও নয়। ধর্মের আক্রোশে যদি বা উপদ্রব নাও করি তবে ধর্মের মোহে মানুষকে নির্জীব করে রাখি, তার বুদ্ধিকে নিরর্থক জড় অভ্যাসের নাগপাশে অস্থিতে-মজ্জাতে নির্দিষ্ট করে ফেলি। দৈবের প্রতি দুর্বলভাবে আসক্ত করে, নানা কাল্পনিক বিভীষিকার বাধায় পদে পদে প্রতিহত করে তাকে লোকযাত্রায় অকৃতার্থ ও পরাভূত করে তুলি। বুদ্ধি যেখানে শৃঙ্খলিত, পুরুষকার যেখানে গুরুভারগ্রস্ত, সেই হতভাগ্য দেশে সর্বপ্রকার দৈহিক মানসিক রাষ্ট্রিক অমঙ্গল অব্যাখ্যাতে অচল হয়ে ওঠে।''(৩৮)
এই চিন্তার অনুসারী ছিলেন বলেই ভারতীয় নবজাগরণের ক্ষেত্রে রামমোহন এবং বিদ্যাসাগরের ভূমিকার নির্যাসটি তিনি তুলে ধরতে পেরেছিলেন। একথা আমরা জানি সনাতন ঐতিহ্যবাহী চিন্তার প্রভাবের জন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গান্ধীজিকে তিনি মূলত সমর্থন করতেন। কিন্তু সেখানেও তা ছিল তাঁর স্বকীয় মতামত বা চিন্তাধারার বিচারবিশ্লেষণের ভিত্তিতেই। গান্ধীজিকে শ্রদ্ধা করলেও রামমোহন-এর প্রতি গান্ধীজির দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। গান্ধীজি হিন্দুধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের অন্যতম পুরোধা হিসাবে একথা বলেছিলেন যে, চৈতন্য, শংকর, কবীর, নানকের তুলনায় রামমোহন একটি ‘পিগমি' বা বামন। ‘রামমোহন ইংরাজী শিক্ষার কারণে ধর্মকে প্রয়োজনে বাহুল্য জ্ঞান করে বাদ দিয়ে চলবার পক্ষপাতী ছিলেন। গান্ধীজি এমনও বলেছেন, ‘রামমোহন যদি ইংরাজী শিক্ষাকে বর্জন করতেন তাহলে তিনি চৈতন্যের মত অনেক মহৎ কাজ করতে পারতেন।'(৩৯) গান্ধীজির এই কথা কবি মেনে নেননি। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘‘যে কারণ ভিতরে থাকাতে রামমোহন রায়ের মত অত বড় মনস্বীকেও মহাত্মা ‘বামন' বলতে কুণ্ঠিত হননি – অথচ আমি সেই রামমোহনকে আধুনিক যুগের মহত্তম লোক বলেই জানি – সেই আভ্যন্তরিক মনঃপ্রকৃতিগত কারণেই মহাত্মাজির কর্মবিধিতে এমন রূপ ধারণ করেছে যাকে আমার স্বধর্ম আপন বলে গ্রহণ করতে পারছে না।''(৪০)
।। সামাজিক আন্দোলন ও তার নেতাদের রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে ।।
বিদ্যাসাগর সম্পর্কে তিনি যে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন তা আমাদের সকলেরই জানা। সেখানেও স্মরণে আসে মনুষ্যত্বের মানবতার জয়গান। বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘বাঙালি জীবনের জড়ত্ব সবলে ভেদ করিয়া, একমাত্র নিজের গতিবেগ-প্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া, হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে, করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন।''(৪১) এমনকী কামাল পাশা সম্পর্কে তিনি যে উক্তি করেছেন তাও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রগতিশীল লেখকদের উদ্দেশ্যে কামালপাশা সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি বলেছিলেন, ‘‘তুর্কিকে তিনি যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছেন, সেইটেই সবচেয়ে বড়ো কথা নয়, তিনি তুর্কিকে তার আত্মনিহিত বিপন্নতা থেকে মুক্ত করেছেন। মুসলমান ধর্মের প্রচণ্ড আবেগের আবর্তমধ্যে দাঁড়িয়ে, ধর্মের অন্ধতাকে প্রবলভাবে তিনি অস্বীকার করেছেন। ... তোমরা প্রগতিপথের তরুণ যাত্রী, আজ তোমাদের সম্মেলনের দিন, সমস্ত এশিয়ার সম্মুখে যিনি প্রগতির পথ উদ্ঘাটিত করেছেন, যাঁর জয়গৌরবের ইতিহাস সমস্ত এশিয়া মহাদেশের বিজয় সূচনা করেছে, সেই মহাবীর কামালের উদ্দেশ্যে ভারতের নবযুগের অভিবাদন আমরা প্রেরণ করি।''(৪২)
আধুনিককালের এই সময়েও অনেকে ‘বন্দেমাতরম' সঙ্গীত গাওয়াকে এবং তাকে বাধ্যতামূলক করার প্রয়াসকে দেশাত্মবোধের সঙ্গে সমার্থ করে দেখেন। এই গান ‘বন্দেমাতরম' গেয়ে এদেশের অনেকেই হাসতে হাসতে জীবন দিয়েছেন স্বাধীনতা আন্দোলনে– একথা ঠিক। কিন্তু ‘ত্বং হি দুর্গা, দশপ্রহরণধারিণী'– হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে কি জবরদস্তি নয়? একথা কবি সেই সময়েই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে সংসদে এই গান গাওয়ার বিষয় সম্পর্কে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘বন্দে মাতরমের মর্মবস্তু হচ্ছে দেবী দুর্গার স্তবগান। কিন্তু সংসদ হচ্ছে সমস্ত ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষের মিলনস্থল। তাই কোন মুসলমানের কাছে এটা আশা করা যায় না যে তারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দশভূজা দুর্গাকে পূজা করবে।''(৪৩) এই সমস্ত ঘটনার দ্বারা একথা বোঝা যায়, সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে সমাজজীবনের ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করা এবং সে সম্পর্কিত চিন্তা, কবির জীবনে ক্রমাগত যে পরিণতির দিকে এগিয়েছে তা গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষের কাছে যথার্থই শিক্ষণীয়।
শুধু তাই নয়, মহাত্মা গান্ধীর প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা থাকলেও যখন ত্রিপুরী কংগ্রেসে ‘মহাত্মা গান্ধী কি জয় !' ‘হিন্দুস্তান কি হিটলার কি জয়' প্রভৃতি শ্লোগান উচ্চারিত হয়েছে তখন কবি খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তীব্র নিন্দায় তিনি বলেছেন, ‘‘অবশেষে আজ কংগ্রেস মঞ্চ থেকে হিটলারি-নীতির নিঃসঙ্কোচ জয় ঘোষণা শোনা গেল। ছোঁয়াচ লেগেছে। আমাদেরই গুরুভজা দেশে লাগবার কথা। স্বাধীনতার মন্ত্র উচ্চারণ করার জন্য যে বেদী উৎসৃষ্ট সেই বেদীতেই আজ ফ্যাসিস্ট সাপ ফোঁস করে উঠেছে।''(৪৪) ইতিহাস থেকে আমরা জানি ধর্মীয় উন্মাদনা, তমসাচ্ছন্ন ধ্যানধারণার পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছিল ফ্যাসিবাদ, সম্ভাব্য সর্বহারা বিপ্লবের হাত থেকে ধনতান্ত্রিক তথা পুঁজিবাদী সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য। আমাদের দেশে বর্তমানে কেন্দে্রর শাসকদল সেই ফ্যাসিস্ট হিটলারকেই তাদের আদর্শ হিসাবে মনে করে এবং তুলে ধরে। ফ্যাসিবাদের নিষ্ঠুরতা সকলেরই জানা। মানবসভ্যতার ঘৃণিত শত্রু এই ফ্যাসিবাদ। কিন্তু তার দার্শনিক ভিত্তির মধ্যে রয়েছে এই পুরাতনী অন্ধকারাচ্ছন্ন চিন্তাভাবনার উন্মাদনা। তাই দেশজুড়ে যখন নতুন করে সেই উন্মাদনাকে গড়ে তোলার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়– গুজরাট গণনিধন যখন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ছাপ পেয়ে যায় তখন অজানা আশংকায় মন শিউরে ওঠে। অথচ এই প্রশ্নে সে যুগেও গান্ধীজির মতো মানুষকেও রবীন্দ্রনাথ সমালোচনা করতে ছাড়েননি।
সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে, কবি নিজে একথা বলেছেন–‘‘পূর্ব পশ্চিমের মিলনমন্ত্র উপনিষদ দিয়ে গেছেন।(৪৫) ...‘‘ভারতবর্ষের সত্য হচ্ছে জ্ঞানে অদ্বৈততত্ত্ব, ভাবে বিশ্বমৈত্রী এবং কর্মে যোগসাধনা''।(৪৬) কিন্তু এতদসত্ত্বেও শিক্ষার ক্ষেত্রে যেমন তিনি ধর্মবিশ্বাসকে সমর্থন করেননি, তেমনি রাষ্ট্রিক জীবনে তাকে অনুসরণ করেননি এবং সেই ক্ষেত্রে গান্ধীজিকেও মেনে নেননি। বরং বলেছেন, ‘‘আমাদের দেশে আধ্যাত্মিক সাধনা ও কর্মসাধনাকে একাসনে বসানো বিপজ্জনক। ...মহাত্মাজি যখন রাষ্ট্রিক উদ্দেশ্য নিয়ে মাঝে মাঝে অনশনব্রত গ্রহণ করেন তখন সমস্ত দেশ উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে, এতে তাঁর আত্মার কী উৎকর্ষসাধন হয় আমি বুঝতেই পারিনে। ...এরকম আধ্যাত্মিক ট্রেড সিক্রেটকে শ্রদ্ধা করব কী করে?''(৪৭)
বেদনার বিষয়, রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর বিশাল প্রতিভার প্রশস্তি গাইতে গিয়ে তাঁর মানবতাবাদী চিন্তাধারার বলিষ্ঠ দিকগুলির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে খুবই কম। সমাজের নামিদামি ব্যক্তিদের নিষ্ক্রিয় জীবনের অবসরে কিছু সময়ের জন্য আসর গরম করা রবীন্দ্র ব্যাখ্যা রবীন্দ্রনাথের জীবন থেকে এ সমাজের এবং এসময়ের প্রাপ্তি ঘটাবে না।
এদেশের নবজাগরণের ইতিহাসে মূলত আপসমুখী ধারার প্রবক্তা হয়েও রবীন্দ্রনাথের জীবনে ও সাহিত্যে যেখানে বলিষ্ঠ চিন্তাগুলি প্রতিফলিত হয়েছে, তার যথাযথ অনুশীলন করা প্রয়োজন। তাহলেই রবীন্দ্রস্মরণ আমাদের সমাজজীবনে হবে সার্থক ও যথার্থই ফলপ্রসূ। দেশ আজ সমস্যাদীর্ণ। সবচেয়ে বড় সমস্যা মূল্যবোধের জগতে। নৈতিকতার সংকটে আবর্ত মানুষের শিল্পসাহিত্য সাধনা, প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা-মনুষ্যত্ব। চাই নতুন মূল্যবোধের সন্ধান। রবীন্দ্রোত্তর যুগে আজ চাই সেই যুগের সকল মনীষী – যাঁরা নবজাগরণের চিন্তা এনেছিলেন, তাঁদের যুগভিত্তিক মূল্যায়ন এবং তাঁদের চিন্তা ও কর্মের নির্যাস গ্রহণ। সেই উদ্দেশ্য নিয়ে সাধারণের ছোঁয়া থেকে দূরে সরিয়ে না রেখে রবীন্দ্রনাথকে সেইদিক থেকে স্মরণ করা এবং বর্তমান সময়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির অপপ্রয়াসকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত ভূমিকা গ্রহণে আত্মনিয়োগ ছাড়া রবীন্দ্র ব্যাখ্যা নিতান্তই অর্থহীন এবং বাস্তবে ক্ষতিকর। ■
তথ্যসূত্র :
১ ‘যুব সমাজের প্রতি'
২ পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্রসংখ্যা, ৪-১১মে, ১৯৯০
৩ ‘‘সফলতার সদুপায়''
৪ ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও আমাদের কর্তব্য
৬ লোকহিত
৭ পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্রসংখ্যা, ৪-১১মে, ১৯৯০
৮ পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্রসংখ্যা, ৪-১১মে, ১৯৯০
৯ পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্রসংখ্যা, ৪-১১মে, ১৯৯০
১০ ‘হিন্দু-মুসলমান' প্রবাসী, শ্রাবণ ১৩৩৮
১১ ‘হিন্দু-মুসলমান' কালান্তর
১২ ‘কোর্ট বা চাপকান' ভারতী, আশ্বিন, ১৩০৫
১৩ সমাজ
১৪ ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও আমাদের কর্তব্য
১৫ ‘ব্রাহ্মণ'
১৬ স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, প্রবাসী, মাঘ, ১৩৩
১৭ ‘হিন্দু-মুসলমান' কালান্তর
১৮ কালান্তর
১৯ ‘হিন্দু-মুসলমান' কালান্তর
২০ বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড
২১ হিন্দু মুসলমান, কালিদাস নাগকে লিখিত পত্র, শ্রাবণ, ১৩২৯
২২ হেমন্তবালা দেবীকে লেখা চিঠি, ২৮ ডিসেম্বর ১৯৩৫
২৩ বাণী ও রচনা, নবম খণ্ড
২৪ ছোটো ও বড়ো, কালান্তর
২৫ ঘরে বাইরে
২৬ কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, কালান্তর
২৭ কালান্তর
২৮ লোকশিক্ষা গ্রন্থমালার বিজ্ঞপ্তি আশ্বিন ১৩৪৪
২৯ কালান্তর
৩০ বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ, ১৯৩২
৩১ শিক্ষা, বিশ্বভারতী
৩২ ঐ
৩৩ হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ১৯১২
৩৪ শিক্ষা বিশ্বভারতী
৩৫ শিক্ষার সাঙ্গীকরণ
৩৬ রাশিয়ার চিঠি
৩৭ হিন্দু মুসলমান, প্রবাসী, শ্রাবণ ১৩৩৮
৩৮ চিঠিপত্র, নবম খণ্ড
৩৯ ইয়ং ইণ্ডিয়া, ১৩.৪.১৯২১
৪০ ‘চরকা'
৪১ বিদ্যাসাগর চরিত
৪২ নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের সম্মেলনে প্রেরিত ভাষণ, ভারতে জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা– ৫ম খণ্ড
৪৩ সিলেক্টেড লেটারস্ অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর
৪৪ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা চিঠি
৪৫ সূত্র– রবীন্দ্রনাথ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্ব, অরবিন্দ পোদ্দার
৪৬ ঐ
৪৭ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা চিঠি, ৩রা এপ্রিল, ১৯৩৯
৪৮ হিস্টি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি, পৃঃ ১৯২, '৯৭
৪৯ রচনাসঙ্কলন, পৃঃ ১৩২-১৩৩
(আলোচনাটি প্রথম মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় পথিকৃৎ পত্রিকার জুলাই ২০০৩ সংখ্যায়, পরে সামান্য পরিমার্জনা করে ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যায়।)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com